Skip to main content

মেয়র আনিসুল হক, হাজার হালি ছাত্র, আর ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

শুভ সকাল।
ট্রাস্টি বোর্ডের সম্মানিত চেয়ারম্যান জনাব সবুর খান,  সম্মানিত ভিসি মহোদয় জনাব ইউসুফ মাহবুবুল ইসলাম, সম্মানিত শিক্ষকবৃন্দ, আমার সামনে হাজারো ছাত্র-ছাত্রী।
সুধী মন্ডলী,
মানুষের জীবনে এমন কতগুলো সময় আসে যখন কথা গুলিয়ে যায়, যখন সমস্ত ভাবনা আগে পরে এক হয়ে যায়। আমার মনে হয় আজকে আমার জীবনে তেমনি একটি সকাল।
যে সকাল বর্তমানের সঙ্গে বছর বছর অনেক বছর  আগেকার দিনগুলোকে এক করে ফেলে।

১৪ বছরেরে কিশোর এই ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটি। আমার এসে মনে হয়েছে চব্বিশ বছরের তরুণ এই ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটি।

তোমরা যারা আজকে এখানে বসে আছো তাদের জন্যে বলি, আমি অনেক ক'বার শুনেছি, মাননীয় মেয়র মাননীয় মেয়র আনিসুল হক অনেক কিছু করেছেন কিন্তু সবুর সাহেব যেটি করে গেছেন তার ট্রাস্টি বোর্ড নিয়ে, তার শিক্ষকদের নিয়ে এবং তোমাদেরকে নিয়ে  আমার মনে হয় বাংলাদেশে এর দ্বিতীয় কোনো উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যাবে না।

আমি আজকে মেয়র হয়েছি। এক সময় অন্য আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে লিড করার সৌভাগ্য আমার হয়েছিলো। হয়তো আরো অল্প কিছু সামনে যেলেও যেতে পারি। কিন্তু যেটি আমি, সবুর সাহেব, এখানে যারা বসে আছে, যারা প্রথম সারির আমার কোণায় বসে আছেন যে সুযোগটি আর কোনোদিন তাদের জীবনে ঘটবে না সেটি হলো, এই দ্বিতীয় রো থেকে বসা সামনে এই দশ পনেরো হাজার এই ছাত্র-ছাত্রী যেই স্বপ্নীল বয়সের একটি সুযোগ জীবনকে দেখার সেই দ্বিতীয় সারিতে বসা আমাদের আর কোনোদিন হবে না।

ওখানে বসে আর আনিসুল হক আর সবুর সাহেবরা স্বপ্ন দেখতে পারবেন না যে জীবনে কি হওয়া যায়।

তোমরা জানো কত ভাগ্যবান তোমরা?

এই যে আমি এই যে এখানেই বোধ হয় চার হাজার মুখ দেখছি।
একটি  প্রতিটি মুখ বলছে যে তার গার্জিয়ানের সংগ্রামের পথ ধরে একটি বাবার স্বপ্ন দেখে, একটি মায়ের স্বপ্ন দেখে আমার ধারণা নাইনটি পারসেন্ট বাচ্চা তোমরা যারা বসে আছো তারা মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্তের ঘরের সন্তান যে তার বাবার স্বপ্নক্‌ তার মায়ের স্বপ্নকে পরিপূর্ণ করার জন্য এখানে এসছো।

আমাদের সময় ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটি ছিলো না। আমাদের সময় সবুর খান সাহেবদের মত বা যারা শিক্ষক আছেন তাদের মত সংঘবদ্ধভাবে কেউ আমাদের হাত তুলে এখানে বসায়নি বা কোনো যায়গায় বসায়নি।
আমার নিজের জীবন অনেক সংঘাতপূর্ণ আমি নিশ্চিত যে এখানে যারা বসে আছেন তাদের জীবনও কারোই যে খুব মধুর জীবন বা সোনার চামচ নিয়ে শুরু হয়েছে জীবন তা কিন্তু নয়।

যে সুযোগ তোমাদের জন্যে ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটি অথবা আমাদের দেশের সমস্ত ইউনিভার্সিটি অথবা আজকের এই দেশ এই বাংলাদেশ একাত্তরে স্বাধীন না হলে এই বাংলাদেশের চেহারা হয়তো আজকে এরকম হতো না। সেই সুযোগের ফল তোমরা আজকে ভোগ করছো।
কিন্তু আমার মনে হয় এইখানে এসে যে বক্তৃতা আমাদের সবুর খান সাহেব দিয়েছেন সময়ের অভাবে ভিসি সাহেব দিতে পারেননি কারণ আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি আমার কিছু তাড়ার জন্যেই__ সারাদিন তোমাদের সাথে কথা বলবেন।

যে সুযোগ তারা সৃষ্টি করেছেন এই সুযোগ কিন্তু সব ইউনিভার্সিটিতে নেই। এমনিভাবে চৌদ্দ বছরের মধ্যে এমনি করে স্তরে স্তরে উঠে যেয়ে ২৬৫টা ইউনিভার্সিটির সঙ্গে মেমোরেন্ডাম সই করে, তিনশ জনের বেশি বিদেশিরা এখানে পড়ে, ষোলো হাজার, পনেরো-ষোলো হাজার ছাত্র-ছাত্রী পড়ে এমন ইন্সটিটিউশন কিন্তু বাংলাদেশে খুব বেশি নেই। সেই ইন্সটিটিউশনের ছাত্র তোমরা।
 সুতরাং নিজেকে প্রথমত ভাগ্যবান মনে করো।

তোমাদের জন্য বলতে চাই, মন থেকে সম্পূর্ণ আজকে আমরা যে বয়সে যেখানে এসে দাড়িয়েছি সেই যায়গা থেকে আমরা অনেক নিচে দেখতে পাই। যে যায়গাটি ওখান থেকে তোমরা দেখতে পাও না। সেই নিচে দেখার এক্সপেরিয়েন্স একেক জনের একেক রকম।
সে জন্যই বিভিন্ন শিক্ষিক, বিভিন্ন মানুষ, বিভিন্ন গুণিজন, বিভিন্ন এক্সপার্টস তোমাদের সামনে আসেন। তোমাদের সঙ্গে তাদের জীবনের কথা বলেন,  তোমাদের সঙ্গে তাদের অভিজ্ঞতার কথা বলেন। সেই অভিজ্ঞতাগুলো সেই জীবনের কথাগুলো তোমরা মনযোগ দিয়ে শুনবে।

এখানে সবাই যে একেবারে কনফিডেন্ট বা যেই ফেমিলির বা আমাদের সোসাইটির যে স্তর থেকে আমরা আসি সেই স্তরেই সবাই যে আমরা খুব কনফিডেন্ট সেটা হয় না। আমাদের মধ্যে এক ধরণের হীনমন্যতা সৃষ্টি হয়, আমাদের মধ্যে এক ধরণের দুর্বলতা সৃষ্টি হয়, আমাদের মধ্যে এক ধরণের কম কনফিডেন্সের সৃষ্টি হয়।
এই ইন্সটিটিউশনগুলো সেই কনফিডেন্স তৈরী করে দেয়। সেই কনফিডেন্সের যায়গাগুলো কিন্তু তোমাদের ধরতে হবে।

আমি জানি এটাই ভাবা স্বাভাবিক। অনেক স্টুডেন্ট আছে যারা ভাবছে আমার বন্ধু তো অনেক বড়লোক। আমার জীবন তো অনেক কষ্টের।
ওকে দেখি ভালো ইংরেজী জানে, আমি তো ইংরেজি জানি না। ওকে দেখি অনেক স্মার্ট, আমি তো স্মার্ট না। ওকে দেখি আরো ভালো ইন্সটিটিউশনে পড়ে! কেউ (NUIU) তে পড়ে কেউ প্রিন্সটনে পড়ে কেউ (সিমেন্সে) পড়ে কেউ (নর্দান ইউনিভার্সিটি) পড়ে কেউ বোস্টন ইউনিভার্সিটিতে পড়ে তাদের সঙ্গে তোমাদের কম্পিটিশন।

স্যো লাইফ ইজ নট ইজি! লাইফ ইজ এ প্লেস টু স্ট্রাগল।

এই জীবন যুদ্ধে কি করে বাঁচবে? এই জীবন যুদ্ধে কি করে আগাবে?
আমি একটি কথাই বলছি সবুর সাহেব বা টিচার যারা আছেন তারা যদি আজকে এইখানে এতো বড় স্বপ্নদ্রষ্টা হতে পারেন, আনিসুল হকের মত একটি মধ্যবিত্ত ঘর থেকে উঠে আসা যে এক সময় মাইলের পর মাইল হেঁটে স্কুলে গেছে, মফস্বলের স্কুলে পড়াশুনা করেছে, মফস্বলের ইউনিভার্সিটিতে পড়াশুনা করেছে, তোমাদের মত ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সুযোগ হয়নি, তোমাদের মত এত ক্যাম্পাসে পড়ার সুযোগ হয়নি। সেই যদি ছোট্ট একটি মেয়র হতে পারে তোমরা প্রতিটি স্টুডেন্ট পৃথিবীর সর্বশেষ্ঠ মানে স্টুডেন্ট সর্বশ্রেষ্ঠ নাগরিক হতে পারো। হ্যাভ দ্যাট কনফিডেন্স ইন ইয়োর মাইন্ড।

প্লিজ! আমি কিন্তু কোনো মিথ্যা কথা বলছিনা।
আমার সময় কম। নাহলে জীবনের এতো বড় বড় সংগ্রাম করে আমরা এসছি। জীবনকে আমরা তখন দেখতে পেতাম না। তখন ইন্টারনেট ছিলো না। আমাদের কাছে সারা পৃথিবী উন্মুক্ত ছিলো না। আমরা জীবনকে দেখতে পেতাম না।

তোমরা এখন জীবনকে কিন্তু দেখতে পাও।
বিল্ডআপ ইয়োর ওউন কনফিডেন্স! আমিই পারবো।
মানুষ পারে না এমন কিছু নেই। মানুষের জন্যেই বলা হয়, মানুষ স্বপ্নের সমান বড়। মানুষ কখনো কখনো স্বপ্নের চাইতেও বড়। সেই স্বপ্নকে যদি তোমাকে ধরতে হয়, সেই স্বপ্ন দেখতে হবে।

আজকে থেকে তিরিশ চল্লিশ বছর আগে ত্রিশ বছর আগে আমরা বা আমাদের মত সবুর খান সাহেবরা আমরা যারা একটু ভালো লেখাপড়া করেছিলাম তখনও কিন্তু আমরা বেকার ছিলাম। আমিই দেড় বছর বেকার ছিলাম। আমিই খুঁজে খুঁজে বেড়িয়েছি যে কি করবো। একবার বিজনেস করি, একবার কাজ করি, এক বছরের জন্য চাকরী করি। সেই নিশ্চয়তা-অনিশ্চয়তা তখন যদি থাকে, এখনও আছে এবং এখন তোমাদের কম্পিটিশন কিন্তু ঢাকার অন্য কোনো ইউনিভার্সিটি নয়, তোমাদের কম্পিটিশন তোমাদেরই অনেক ভাই-বোন, তোমাদেরই অনেক বন্ধু বিদেশের আরো স্ট্রং ইউনিভার্সিটিতে পড়ছে । কেউ প্রিন্সটনে পড়ছে, কেউ এমআইটিতে পড়ছে, কেউ ক্যাল্টেকে পড়ছে, কেউ করনেলে পড়ছে।
তাই বলে কি হারিয়ে যাবো আমরা?
আমরা কি কম্পিটিশন করে, সবুর সাহেব কি কম্পিটিশন করে আজকে এতো বড় দুনিয়া তৈরী করেননি?
আমাদের মত সামান্য যারা মধ্যবিত্ত ঘর থেকে নিজেদের উঠিয়ে এনেছি তারা কি সমাজে এক ধরণের নিজেদের পদাঙ্ক সৃষ্টি করিনি?

আমরা যদি করতে পারি তোমাদের মধ্যে যেই সুপ্ত সুযোগ আছে তোমরা পৃথিবী জয় করতে পারো। সারা পৃথিবী জয় করতে পারো।

আমি আসতে আসতে দেখছিলাম যে, সব খুব গল্প করছে । সবাই। অল ইয়াং পিপল আর হেয়ার। তো ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে একটা ট্রাডিশন আছে, তোমরা যদি ঢাকা ইউনিভার্সিটির পাশ দিয়ে আজকে যাও, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ঢাকা শহরের সব চাইতে বড় উদ্যান। (ও বোধ হয় গল্প টা শুনেছে) তো ওখানে দেখবে দূর থেকে যদি একটা দূরবীন নাও বা কাছে দিয়ে হেঁটে যাও একটি ছেলে একটি মেয়ে বসে শুধু (ঐ হাসে হা হা)  এবং দেখবে দুজনেরই ঠোঁট একই রকম নড়ে।
ওরা কি বলে?
একজন বলে আমি তোমাকে ভালোবাসি। মেয়েটা বলে আমি আরও ভালোবাসি।
কিন্তু দুজনেই জানে দুজনেই মিথ্যে কথা বলছে!
তো তোমাদের সেই বয়স। আমাদের সেই বয়স নেই।
আমার ভাল লাগছে হেঁটে কিন্তু ওরকম গাছের নিচে বসা নেই, একটি নির্মল পবিত্র মেলামেশা আছে। এটি প্রয়োজন জীবনকে জানার জন্যে।

আমাকে যদি আজকে জিজ্ঞেস করা হয় তোমার জীবনের সবচাইতে বড় শক্তি কি ছিলো? আমি জানি না অন্য কে কি বলবে। আমি নিশ্চিত করে তোমাদের বলতে পারি, আমি যে কোনো যায়গায় বলবো, যে কোনো পরিস্থিতিতে বলবো, আমার জীবনের সবচাইতে বড় শক্তি ছিলো আমার মায়ের দোয়া।
তোমাদের কাছে আজকে এটা ইমোশনাল কথা মনে হতে পারে। কিন্তু জীবনে যখন আমার যায়গায় আসবে অথবা আমাদের যায়গায় আসবে তখন দেখবে ওটা কি শক্তি!

আমি দুটো গল্প বলবো আজকে এখানে।  একটি আমার মায়ের গল্প আরেকটি অন্য একটি মায়ের গল্প।

আমার মা'র কোনো কিছু হলেই আমি বলতাম, পায়ের নিচে শুয়ে বলতাম আমার গায়ের উপর একটা পা রাখোতো আর আমাকে একটা ফু দাও।
তো আমার জীবন এখনো ফু এর মধ্যেই চলছে।
আমি যখন মেট্রিক পরীক্ষা দেই, আগের রাতে আমার অনেক জ্বর, অনেক অনেক জ্বর ১০৪ ডিগ্রী হবে।
তো আমি সকালবেলা উঠে বললাম মা, আমিতো পরীক্ষা দিতে পারবো না। আমার মা আর দশটা মায়ের মত খুব শিক্ষিত নয়।
তো আমার মা বললেন, এটা কি হয় নাকি রে বাবা? তুমি যদি এবার পরীক্ষা না দাও, তুমি তো এক বছর ফেইল করে যাবে।
আমি বললাম, আমার তো কোনো উপায় নেই আমি তো চোখে কিছু দেখছিনা।
উনি অনেক দোয়া টোয়া করে আমাকে একটা ফু দিলেন। দিয়ে হাত ধরে বললেন চলো যাই। পরীক্ষা ৩ ঘন্টার যায়গায় প্রায় দু'ঘন্টা পরীক্ষা দিয়ে বেরিয়ে গেলাম। বাইরে মানে বিপর্যস্ত মা বসে আছেন আমার ছেলে কি করছে ভিতরে!
বাইরে বেরোলাম, বললো কি পরীক্ষা শেষ হয়েছে? সব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছো?
আমি বললাম "না" মাত্র ৩৪ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছি! ৩৪ নাম্বার।
তো বলে পাশ কততে?
আমি বললাম পাশ তো তেত্রিশে।
আমি বললাম মা, তোমার ফু আর কোনো কাজ হবে না।
বলে আচ্ছা কাজ না হোক আসোনা একটা ফু দেই। এবার ফু'টা একটু নামাজ পড়ে দেই।

ওখানে দু'রাকাত নামাজ পড়লেন, একটা ফু দিলেন সারা গায়ে!
বিলিভ মি!! এটা হয়তো... হয়তো এটা এক ধরনের কাকতালীয় ব্যাপার হতেই পারে কিন্তু আমি আজো বিশ্বাস করি, ৩৪ এ ৩৪ ই পেয়েছিলাম।

স্যো আনিসুল হকের জীবনে ঐ মা'র দোয়া দিয়ে আমার সারা জীবনে এখনো কোনো কিছু হলে মায়ের কবরের কাছে যাই, যেয়ে দাড়াই, এই কি বলে মেয়রের পদে আমি দাড়াবো না দাড়াবো না ঠিক করছিলাম। যে আমার দ্বারা তো খুব কঠিন একটি কাজ বাট আমি মানসিকভাবে তৈরী নই।
তো আমার বাবার বয়স পঁচানব্বই।
বাবাকে যেয়ে বললাম বাবা, কি করবো? মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চান যে আমি মেয়র হই। একটি বড় উপহার একজন প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে। কি করি আমি?
বলে, তোমার মায়ের কাছে যাও।
তো আমি বলি মা তো কবরে।
বলে, ঐখান থেকেই ফু দিবে ঘুরে আসো।

তো বুঝলাম বুড়া বোধ হয় আগের দিন রাতে বুড়িকে স্বপ্নে দেখছে।



আরেকটি মায়ের গল্প বলি। এ মায়ের গল্প তোমরা অনেক পড়েছো। শুধু মা'ই পারে এটা করতে।
৭১ সাল। ১৫ই আগস্ট। একটি ছেলে রমনা থানায় আটকে গেছে। মাকে খবর পাঠানো হয়েছে যে ছেলেকে এরেস্ট করা হয়েছে। কারণ সে মুক্তিযুদ্ধের কাজ করতে চায়। বাকের নাম ছেলেটির।
ছুটে গেছে মা। সন্ধ্যার সময়। জড়িয়ে ধরতে পারে না কারণ মাঝখানে তো জেলের দেয়াল, জেলের রড সমস্ত থানার মধ্যে।
ছেলেটা কাঁদতে কাঁদতে বললো মা, তিনদিন থেকে এখানে আছি ভাত খেতে দেয়নি।
মা আর কোনো কথা না বলে ছুটে গেছে। তিন ঘন্টা পরে এসছে ভাত নিয়ে।
ছেলে নেই।
সেই ছেলেকে আর পাওয়া যায়নি।
মা মারা গেছে পনেরো বছর পর ৮৫'র সেই একই দিনে। এই পনেরো বছর সেই মা একটি ভাত খায়নি। একটি লোকমাও ভাত খায়নি।
কারণ সে তার ছেলে বাকের কে খাওয়াটা দিতে পারেনি। এই হলো মা।


সুতরাং আমি তোমাদের বলি, এই বয়সে এসে আমার বয়সে কিন্তু আমি বুঝতাম না মা'র বা বাবার দোয়া কত (বক্তব্য স্পষ্ট না থাকায় বোঝা যায়নি----------)পরিশ্রম!

ওদের একটা স্বপ্ন আছে তোমাকে নিয়ে। সেজন্যই এতো কষ্ট করে তোমাকে পড়ায়। ওদের একটা স্বপ্ন আছে বাচ্চা এটা হবে, ওটা হবে। তোমার স্বপ্নের সঙ্গে সেটি নাও মিলতে পারে।
স্বপ্ন নেই জীবনে এমন কোনো মানুষ নেই। স্বপ্ন মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে।

আমার বাবা, যার বয়স ৯৫ বছর। গত একমাস থেকে যিনি খাট থেকে উঠতে পারেন না তাকেও আমি স্বপ্ন দেখতে দেখি। এক বছর আগে বা আট মাস আগে স্বপ্ন ছিলো, এই ছেলেতো অনেক যায়গায় অনেক মাদবরী টাদবরী করেছে ছেলেটা যদি মেয়র হয়!
তার স্বপ্ন ছিলো তার একটি ছেলে সে সেমি-আর্মি তে কাজ করতো আনসারে, সব সময় স্যালুট দিতো। তো আমার ছোটো ভাইকে বললো আমি চাই আমার স্বপ্ন আমার কোনো ছেলে স্যালুট নিক।

আমার ছোটো ভাই খুব স্কলার ছেলে ছিলো। সে তার স্বপ্ন ছেড়ে দিয়ে, বাবার স্বপ্নের সঙ্গে নিজের স্বপ্ন মিলিয়ে আর্মিতে গিয়েছিলো। আর এই বাবার স্বপ্ন ছিলো এক বছর আগে, আমার ছেলেতো আমার স্বপ্ন নিয়ে তার স্বপ্নকে ছেড়ে দিয়েছিলো, তার স্বপ্ন ছিলো স্কলার হওয়ার। সে বাবার স্বপ্নকে মিলাতে যেয়ে আর্মি হয়ে গেছে। সেই বাবার দোয়া, সেই মা'র দোয়া তার জীবনকে মানে উজ্জ্বলিত করে দিয়েছে। তার স্বপ্ন ছিলো তার ছেলে সেনাবাহিনী প্রধান হোক।
আল্লাহ আমার মা'র, আমার বাবার সে স্বপ্ন পূরণ করেছে।

তোমাদেরও বলি, মায়ের স্বপ্নের সঙ্গে, বাবার স্বপ্নের সঙ্গে তোমার স্বপ্ন মিলবে এমন কোনো কথা নেই।
আজকে সকালে আমার বাবা বলে, একটু দেশের বাড়িতে যাওয়া যায় না?
আমি বলি, আমার বাবাকে তো হেলিকপ্টারেও নেয়ার কোনো উপায় নেই।
তার মানে কি? মানুষ মৃত্যুর আগের মুহূর্তেও স্বপ্ন দেখে।

আর তোমরা কত ভাগ্যবান যে, তোমাদের স্বপ্নে সময় মাত্র শুরু হলো।
সুতরাং আমার মনে হয়, আমার বাবা বলতেন, সব মুরুব্বীরা বলেন, তোমাদের টিচাররা বলেন, জীবনের এই স্বপ্ন দেখাকে বড় করে স্বপ্ন দেখো। জীবনের চল্লিশ বছর বয়সে কি হতে চাও, পয়তাল্লিশ বছর বয়সে কি হতে চাও, পঞ্চাশ বছর বয়সে কি হতে চাও সেই স্বপ্ন দেখো।

আমার স্ত্রীকে আমি সব সময় বলি যে, তুমি মাফিয়ার চেয়েও খারাপ।
তো বলে কেন?
তো মাফিয়া ওয়ান্টস আইদার ইয়োর লাইফ অর ইয়োর মানি বাট ইউ ওয়াইফ ইউ ওয়ান্টস বোথ লাইফ এন্ড মানি!

তো তার একটি গল্প আমি তোমাদের বলি। তাহলে বুঝবে মানুষের স্বপ্ন, মানুষের দৃঢ়তা  মানুষকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে।
এক সময় আমি টেলিভিশনে মোটামুটি তোমাদের জন্মও হয়নি তখন হয়তো এনারা জানেন টেলিভিশনে আমার মোটামুটি পরিচিতি ছিলো। তখন আমার স্ত্রী তিনিও একটি তিনি কখনো সেকেন্ড হননি জীবনে। তিনি-- ফযলে লোহানী আপনারা চিনেন স্যার? ভালো ডিবেটার ছিলেন। চার বছরে---। ইন্টারমিডিয়েটে ফার্স্ট হবার পরে এই সময়টিতে জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় আসলেন। জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় আসার পরে একটি সন্ধ্যায় আমাদেরকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হলো। ফযলে লোহানী ছিলেন সেখানে। আমার স্ত্রী অন্যদিকে প্রোগ্রাম করতেন, আমি তরুণ হিসেবে একটা প্রোগ্রাম করতাম।
তো কখনো কখনো আমার প্রোগ্রামটি অনেক ভালো হয়ে যেতো আরকি। তো এক ধরণের হিংসা-প্রতিহিংসা ছিলো। তখনও তিনি আমার স্ত্রী হননি।
এক সন্ধ্যায় আমাদেরকে তুলে নিয়ে যাওয়া হলো। তুলে নিয়ে যাওয়ার পর, ছোট্ট করে বলি যে প্রোগ্রামটি আমাদের দ্বারা করতে বলা হলো যেন ছেলেদেরকে বলা, ইউনিভার্সিটির এই স্ট্রাইকের সময়, হরতালের সময় যে তোমরা স্ট্রাইক করো না, হরতাল করো না, তোমরা বাস পুড়ো না। এই ছিলো আইটেম। আমি পালিয়ে এসছিলাম আর্মি হেড কোয়ার্টার থেকে। সে পালিয়ে আসতে পারেনি।
লোহানী সাহেবকে একটা প্রোগ্রাম করতে হয়েছিলো। সেই লোহানী যিনি সব চাইতে বড় একটি উপস্থাপক ছিলেন, বিশাল একজন সাংবাদিক ছিলেন। একটি দশ মিনিটের প্রোগ্রাম তার জীবন ঘুরিয়ে দিয়েছিলো।
তেমনিভাবে আমার স্ত্রী সেদিন করতে হয়েছিলো তৎকালীন তখন আমার স্ত্রী হয়নি।
আমি তাকে বলেছিলাম পালিয়ে যাও, আমি পালিয়ে যাচ্ছি আজকে প্রধানমন্ত্রীর এই দফতর থেকে। সে বলেছে, না আমি করবো মিস্টার আনিসুল হক। তার ল্যাংগুয়েজে আমি বলি, "আপনার নিজের চড়কায় তেল দেন আমার চড়কায় তেল দেওয়ার দরকার নেই"

সেদিন সন্ধ্যায়...
না না তালির না....

একটি দশ মিনিটের প্রোগ্রাম একটি মেয়ে জীবনে যে সেকেন্ড হয়নি তার জীবন ঘুরিয়ে দিলো। সে আর কোনোদিন ইউনিভার্সিটিতে যেতে পারেনি। কোনোদিন না। তার গাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হইয়েছিলো তিনমাস পরে। তার গায়ে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়েছিলো। এটি শুধু হয়েছিলো টেলিভিশনের কল্যাণে।
সে যেভাবে প্রোগ্রামটি করেছিলো তার কথাগুলো প্রচারিত করা হয়নি।

সে মানুষটি যাকে মাফিয়া বলি সেই মানুষটি বাইশ বছর পরে গ্রাজুয়েশন দিয়েছে। বাইশ বছর সে ঠিক মত জীবনের সংগ্রামের জন্যে পড়াশুনা করতে পারেনি। ফার্স্ট হয়েছে। পঁচিশ বছর পর মাস্টার্স দিয়েছে। ফার্স্ট হয়েছে। আটাইশ বছর পরে ডক্টরেট করেছে ইংলিশে। এখন শি ইজ ওয়ান ওব দ্যা হান্ড্রেড লেডি অব দ্যা ওয়ার্ল্ড, বিবিসির নির্বাচিত বাংলাদেশ থেকে একমাত্র।

শি রাইটস এভরি ওয়েডনাস ডে ঐ যে এডিটোরিয়াল প্যাক ইন ডেইলিস্টার।
এ বছর সে বাংলাদেশের দ্যা বেস্ট এন্ট্রপ্রেনার ডেইলি স্টারের।
ব্যবসা করে। ও ব্যবসা করে আনিসুল হক__ ও কামায় আনিসুল হক খায়।

এন্ড এই গল্পটা তোমাদের এই জন্য বললাম, জীবনে অনেক ধরনের ভাঙন আসবে।
তোমরা যারা মধ্যবিত্ত পরিবার দেখবে যে এক সময় বাবা পড়াতে পারছে না, দেখবে যে এক সময় তুমি কোনো কারণে নরমাল গতি থেকে হারিয়ে গেছো, ডোন্ট লুজ ইয়োর কারেজ।

এত বড় একটি স্বপ্ন যদি পনেরো বছর আগেও কিন্তু সবুর সাহেবের এই স্বপ্ন ছিলো না। বিশ বছর আগে তো ছিলোই না। এতো বড় একটি স্বপ্নের মানে বাগান যদি তৈরি করতে পারেন সবুর সাহেব এরকম আরো অনেক........................।

একদম সামান্য একটি মধ্যবিত্ত ঘর থেকে উঠে এসে আনিসুল হক যদি মানে ছোট খাটো মেয়র হতে পারে তোমরা তো পৃথিবী জয় করতে পারো। ইউ ক্যান উইন দ্যা ওয়ার্ল্ড এন্ড প্লিজ হ্যাভ ইয়োর কনফিডেন্স। এই একটি জিনিসই মানুষকে বদলিয়ে দেয়।

যদি হাওয়া খেতে হয় তাহলে নদীর তীরে যেতে হয়, যদি সুন্দর সাগর দেখতে হয় কক্সবাজারে যেতে হয় যদি সুন্দর পর্বত দেখতে হয় হিমালয়ে যেতে হয়, যদি ভালো মানুষ হতে হয় ভালো মানুষের সঙ্গে মিশতে হয় ভালো মানুষের কথা পড়তে হয়। ভালো মানুষের বই পড়ো ভালো মানুষের জীবনী পড়ো।

 আর আজকে এখানে যারা এসছো, পাচ-সাত বছর পরে কোথাও যেন তোমাদের সঙ্গে দেখা হয় এবং যেন বলো "আনিস সাহেব, আমি এটি হয়েছি" তোমাদের জন্যে সেই দোয়াই রইলো।

আমাকে আজকে এখানে আমন্ত্রণ করার জন্যে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

Comments

Popular posts from this blog

ড্যাফোডিলে নতুন? মন চাইলে পড়ো।

বিঃদ্রঃ এইটা কোনো অফিশিয়াল কিছু না। নিতান্তই আমার মাথায় যা আসছে তার গর্ভপাত ঘটছে এইখানে। কমলা রঙের লেখায় ক্লিক করলে হাবিজাবি আসবে। ইচ্ছা হইলে ক্লিক কইরা দেখা যাইতেই পারে।  " ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি -আশুলিয়া ক্যাম্পাস" DIU Permanent Campus Photo Gallery থেকে নেয়া। চারটা পাবলিকে ডাব্বা মারার পর সরকারি তোলারাম কলেজে আমি বাংলা পাইছিলাম। বিভাগীয় প্রধান বলছিলেন, তোমার মা যদি কালো হয়, দেখতে বেখাপ্পা হয় তুমি কি তারে মা ডাকবানা? তার আদরে নিজেরে জড়াবা না? তাকে তো চাইলেই আর বদলানোর কোনো সুযোগ নাই তাই না? অবশ্যই সে কালো খাটো মোটা যাই হোক তাকেই মেনে নিবা। এবং সেই তোমার মা। বাংলা বিষয়টা তোমার মা। এবার তাকে ইচ্ছায় পেয়ে থাকো অথবা অনিচ্ছায়। হা হা। এই মহা সত্যটা এখন তোমারেও মাইনা নিতে হবে। ঠেকায় পইরা আসো, পছন্দে আসো অথবা যে কারণেই ড্যাফোডিলে আইসা থাকো না কেন এখন এইটা তোমার মা। ভালো এরে বাসতেই হবে। মানায়া নিতেই হবে। জোর কইরা হইলেও। আর যদি না পারো তাইলে কমোডে পোলাও রেখে খাবার মত ব্যাপার হবে চার বছর পর। নতুন তুমি? তাইলে নিচের এগুলা ভাল লাগলে দেখতে ...

ফেস্টাটা

সিপিইউটা লঞ্চের মতন আওয়াজ তুইলা চলে। হানিফ পরিবহনের সড়ক পথে বিমানের ছোঁয়ার মতন রুমে বইসা লঞ্চের ছোঁয়া আমি পাইতেছি। ভাবে মরি মরি অবস্থা। খাই দাই ঘুমাই আর খালি প্লান করি করমু কোন কাম। প্লান করি তারপর পিসিতে বইসা ফেইসবুক তারপর আবার ঘুম। আর তারপর আবার প্লান করি। পাকিস্তান-ভারত নিয়া একটা গেইম। এখন সিধান্ত নিতে বলা হইলো আমি ভারত সাইজা খেলবো নাকি পাকিস্তান!! আবার প্লান করতে বসলাম আমি কার হইয়া খেলবো। গুলি কইরা সব ফাটায় দিছি। মাথায় গুলি করলে প্রথম গুলিতে হেলমেট পইড়া যায় আর পরের গুলিতে মইরা যায়। হেলমেট পইড়া যাবার ব্যাপারটা ভাল লাগছে। ইতিহাস নামের একটা সিনেমা ছিলো। মারূফ ছিলো নায়ক। সে যখন গুলি করে রক্ত কেমন ভরভর কইরা ছড়ায়া বড়ায়া বাইর হয়। ঐ ছবি আরেকজনের বাসায় দেখতে গিয়া আব্বুর মাইর খাইছি। এই গেইমের মধ্যেও রক্ত ঐভাবেই বাইর হয়!! নকল করছে নাকি ব্যাপারটা?? আচ্ছা মানুষ গেইম কেন বানায়? বুশেরে জুতা মারার ব্যাপারটা নিয়া কারা যেন একটা গেইম বানাইছিলো। একটু আগে ভাবতেছিলাম আমি বানাইলে এইটারে কেমনে রিলিজ করতাম? নিজের নামে? নাকি ভারতের একজন আর পাকিস্তানের একজনের নামে? ...